September 17, 2026, 2:23 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে প্রায় ৪ হাজার মেট্রিক টন বা ৪৭ লাখ লিটার পরিশোধিত ডিজেল বাংলাদেশে এসেছে। দিনাজপুরের পার্বতীপুর রিসিভিং টার্মিনাল ডিপোতে পৌঁছানো এ চালানটি পাইপলাইনের ৭২তম চালান। গত ১৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় ডিজেল সরবরাহ শুরু হয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর তা সম্পন্ন হয়। পার্বতীপুর রেল ডিপোর পরিচালন ব্যবস্থাপক মো. রবিউল আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জ্বালানি সরবরাহে সাম্প্রতিক চাপ এবং চাহিদা বৃদ্ধির মধ্যে ভারত থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানির ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ এ চালান এসেছে। এর আগে আগস্টে বাংলাদেশ ভারতকে মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহের অনুরোধ জানায়। সেই অনুরোধের পর সেপ্টেম্বরের এই চালান পাঠানো হলো।
এ বছর আমদানি ৬২ হাজার টনের বেশি
২০২৬ সালে মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ডিজেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন চালান মিলিয়ে মার্চে ১৭ হাজার টন, এপ্রিলে ২৫ হাজার টন, মে মাসে ৮ হাজার টন এবং জুলাইয়ে আরও ৮ হাজার টন ডিজেল আমদানি করা হয়। সর্বশেষ প্রায় ৪ হাজার টন যোগ হলে চলতি বছরে এ পথে আমদানির পরিমাণ প্রায় ৬২ হাজার টনে দাঁড়ায়।
এর মধ্যে মার্চ ও এপ্রিলের আমদানির পেছনে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির চাপ গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। মার্চে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক সরবরাহ-ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশ ভারত থেকে পাইপলাইনে ডিজেল আমদানি বাড়ায়। এপ্রিলেও কয়েক দফায় বড় চালান আসে। সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চে ৫ হাজার টন করে দুই দফায় ১০ হাজার টন এবং ১ এপ্রিল আরও ৭ হাজার টনসহ মোট ১৭ হাজার টন ডিজেল আসে।
এপ্রিলে আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫ হাজার টন। মাসের বিভিন্ন সময়ে ৮ হাজার, ৫ হাজার, ৭ হাজার এবং আরও ৫ হাজার টনের চালান আনার কথা জানানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তখন জানিয়েছিলেন, পাইপলাইনের মাধ্যমে আমদানি অব্যাহত রাখার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দেশের জ্বালানি মজুত স্বাভাবিক রাখা এবং সরবরাহে কোনো বিঘ্ন না ঘটানো।
মে মাসেও আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে দুই দফায় মোট ৮ হাজার টন ডিজেল আসে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সেচ মৌসুমে ডিজেলের চাহিদা বাড়ে এবং এ কারণে পাইপলাইনের মাধ্যমে নিয়মিত সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে শুরু হয়েছিল মৈত্রী পাইপলাইন
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সরাসরি জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য মৈত্রী পাইপলাইন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে। দুই দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০১৮ সালের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী, ১৫ বছরে পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়।
পাইপলাইনটি ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড (NRL) থেকে বাংলাদেশের দিনাজপুরের পার্বতীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত। বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২৬.৫৭ কিলোমিটার। পুরো ক্রস-বর্ডার পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩১ কিলোমিটার। বাংলাদেশের অংশটি পঞ্চগড়, নীলফামারী ও দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করে পার্বতীপুরে পৌঁছেছে।
২০২৩ সালের ১৮ মার্চ দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়ালি ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন (IBFP) উদ্বোধন করেন। এটি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রথম আন্তঃসীমান্ত জ্বালানি পাইপলাইন। প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ছিল ৩৭৭ কোটি ভারতীয় রুপি। এর মধ্যে বাংলাদেশের অংশের প্রায় ২৮৫ কোটি রুপি ভারত সরকারের অনুদান হিসেবে বহন করার কথা জানানো হয়েছিল।
বছরে ১০ লাখ টন পরিবহনের সক্ষমতা
মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে বছরে সর্বোচ্চ ১০ লাখ মেট্রিক টন উচ্চগতির ডিজেল (HSD) পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে। উদ্বোধনের সময় ভারত সরকার জানিয়েছিল, পাইপলাইনের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিবহন ব্যবস্থা চালু হওয়ায় সড়ক ও রেলপথের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় ও সময় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পাইপলাইন চালুর পর থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত এর মাধ্যমে বাংলাদেশে মোট ৩ লাখ ৩০ হাজার ৮৭ মেট্রিক টন ডিজেল এসেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বশেষ চালানটি যুক্ত হওয়ার পর এ পরিমাণ আরও বেড়েছে।
নুমালিগড় থেকে পার্বতীপুর
মৈত্রী পাইপলাইনের উৎস ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি। বাংলাদেশে পাইপলাইনের মাধ্যমে নুমালিগড় থেকে পরিশোধিত ডিজেল সরবরাহের কার্যক্রম ২০২১ সাল থেকেই নিয়মিতভাবে চলে আসছে। ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তঃসীমান্ত পাইপলাইন প্রকল্প উদ্বোধনের পর সরবরাহ ব্যবস্থা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
পার্বতীপুরে পৌঁছানোর পর আমদানি করা জ্বালানি রাষ্ট্রায়ত্ত পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল-এর মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। উত্তরাঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহে পার্বতীপুর ডিপো এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্ব
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিভিন্ন পথে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করা হয়। এর মধ্যে পাইপলাইনভিত্তিক আমদানির বিশেষ গুরুত্ব হলো—বন্দর, জাহাজ, সড়ক বা রেলপথের একাধিক ধাপের পরিবর্তে নির্ধারিত উৎস থেকে সরাসরি টার্মিনালে জ্বালানি পৌঁছানো যায়।
২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিলের আন্তর্জাতিক সরবরাহ পরিস্থিতির চাপের সময়ও পাইপলাইনটি বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হয়েছে। তবে একই সময়ে সরকারি কর্মকর্তারা দেশের মোট জ্বালানি মজুতকে পর্যাপ্ত বলে উল্লেখ করেছিলেন। জুলাইয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, দেশে প্রায় ৩ লাখ ৪৪ হাজার টন ডিজেল মজুত ছিল এবং তাৎক্ষণিক কোনো জ্বালানি সংকট ছিল না।
অর্থাৎ, সর্বশেষ চালানকে সরাসরি কোনো জাতীয় জ্বালানি সংকটের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং তথ্যগুলো থেকে দেখা যায়, দেশের জ্বালানি মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত ডিজেল আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সামনে আরও সরবরাহের সম্ভাবনা
আগস্টে বাংলাদেশ অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করেছিল। এর ধারাবাহিকতায় সেপ্টেম্বরে প্রায় ৪ হাজার টনের সর্বশেষ চালান এসেছে। ফলে মৈত্রী পাইপলাইন আগামী দিনগুলোতেও বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
তবে পাইপলাইনের বর্তমান বার্ষিক সক্ষমতা ১০ লাখ টন হলেও ২০১৮ সালের চুক্তিতে ১৫ বছরে প্রায় ২০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ফলে সক্ষমতা ও বাস্তব ব্যবহারের মধ্যে এখনও যথেষ্ট ব্যবধান রয়েছে। সর্বশেষ চালানসহ ২০২৩ সালে উদ্বোধনের পর এ পর্যন্ত আমদানির পরিমাণও বার্ষিক সর্বোচ্চ সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা, মজুত সক্ষমতা এবং বিকল্প আমদানি উৎস—সবগুলো বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। মৈত্রী পাইপলাইন সেই বৃহত্তর জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে কাজ করছে।
সর্বশেষ ৪৭ লাখ লিটারের চালানটি তাই শুধু একটি নতুন জ্বালানি চালান নয়; এটি ২০১৮ সালে শুরু হওয়া বাংলাদেশ-ভারত জ্বালানি অবকাঠামো সহযোগিতার ধারাবাহিকতারও একটি অংশ। ২০২৩ সালে চালু হওয়ার পর পাইপলাইনটি এখন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পরিশোধিত ডিজেল সরবরাহের একটি স্থায়ী অবকাঠামোগত পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।